বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই।
(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার ইন্তেকালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শাসনামলে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়। এ সময় কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প খাতে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় প্রায় ২৯ শতাংশ, যেখানে প্রায় দুই লাখ নারী শ্রমবাজারে যুক্ত হন।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বেগম জিয়া বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানিবণ্টন সমস্যা উত্থাপন করে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার দাবি জানান। ১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সংকট বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তিনি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও পুনরায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এক মাসের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। একই বছরের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও ১১৬টি আসন পেয়ে সংসদের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৯৯ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০০৫ সালে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থানে স্থান দেয়।
২০০৬ সালে তিনি পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে ও তার পরিবারকে নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর একটি স্বৈরাচারী সরকার দুর্নীতির তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করে।
তার শাসনামলে শিক্ষা খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য সহায়তা চালু করা হয়। এছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয় এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বেগম খালেদা জিয়া কোনো সংসদীয় আসনে পরাজিত না হওয়ার বিরল রেকর্ডের অধিকারী। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি ভিন্ন সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই তিনি জয়লাভ করেন।
২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর করলে তিনি পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয় হন। এ সময় তাকে জোরপূর্বক নিজ বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং গণতন্ত্রের আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে তাকে দুই দফা গৃহবন্দী করা হয়। গণতন্ত্রের পক্ষে তার ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাকে “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” উপাধিতে সম্মানিত করে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে তাকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিসেস প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, মূলত তাকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এ সাজা দেওয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, এই মামলায় তার ন্যায্য বিচারের অধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।


0 coment rios: