মহম্মদ আজিজ: বাংলা ও বলিউডের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী
![]() |
| Mohammad Aziz: The Legendary Playback Singer of Bengal and Bollywood |
মহম্মদ আজিজ: জীবনী
মহম্মদ আজিজ, যিনি সাইদ মহম্মদ আজিজ উন নাবি ওরফে মুন্না নামেও পরিচিত, ১৯৫৪ সালের ২ জুলাই কলকাতার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভারতীয় সঙ্গীতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মহম্মদ রফির অগাধ ভক্ত ছিলেন। রফির গান শুনে তাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন এবং সেই সঙ্গে সংগীত চর্চাও শুরু করেছিলেন। তবে, তার জীবন পথ সহজ ছিল না।
শৈশব ও তরুণ বয়স
আজিজের শৈশব ছিল বেশ সাধারণ। ছোটবেলায় গান শিখতে শুরু করলেও, পরিবারের আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি একটি চাকরি খুঁজছিলেন। অর্থের তাড়নায় তার গান শেখার সময় কমে যায় এবং বড় মঞ্চে গান গাওয়ার স্বপ্ন কিছুটা মলিন হয়ে যায়। তবে, আজিজের মনোবল ছিল অটুট। তিনি মঞ্চে গান গাইতে না পারলেও গান নিয়েই জীবিকা উপার্জনের সিদ্ধান্ত নেন এবং কলকাতার নামী বার ও রেস্তোরাঁয় গান গাইতে শুরু করেন।
মুম্বইয়ের পথে
আজিজের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে যায় মুম্বই যাওয়ার মাধ্যমে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মুম্বই গিয়ে সঙ্গীতের বিশ্বে সফলতা অর্জন করবেন। পরিবারকে আশ্বাস দিয়ে তিনি দু’বছরের সময় নিয়ে মুম্বই চলে যান। কিন্তু ১৯৮০ সালে মহম্মদ রফির মৃত্যু তাঁর জীবনে এক বড় ধাক্কা ছিল। তার প্রিয় গুরুর প্রয়াণের পর আজিজের কাছে মনে হয়েছিল, তার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। তবে, আজিজ হার মানেননি এবং মুম্বইয়ে তাঁর সংগীত কেরিয়ার শুরু করতে যান।
বলিউডে আত্মপ্রকাশ
মুম্বই গিয়ে সঙ্গীতের জগতে পা রাখার পর, আজিজ প্রথমে সেলিম আখতারের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তার পরপরই তিনি অনু মালিকের সঙ্গে পরিচিত হন, যিনি তাকে তার সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন। "মর্দ" ছবির একটি গানে আজিজ গাইলে, তার কণ্ঠের সাথে রফির কণ্ঠের মিল পাওয়া যায়, যা বলিউডে তাকে পরিচিতি এনে দেয়।
এ সময়, শাব্বির কুমার এবং আনওয়ারের মতো রফি-কণ্ঠী গায়কদের প্রভাব কমে যেতে শুরু করেছিল। আজিজের কণ্ঠের তুলনা অনেকেই রফির কণ্ঠের সঙ্গে করতেন। তার গাওয়া গানগুলো খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। একে একে দিলীপ কুমার, রাজেশ খন্না, ধর্মেন্দ্র, শাহরুখ খান, সঞ্জয় দত্ত, অক্ষয় কুমার, মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বলিউডের তারকাদের জন্য গান গেয়েছিলেন তিনি।
সঙ্গীত ক্যারিয়ার
১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মহম্মদ আজিজ একের পর এক হিট গান উপহার দিয়েছেন। তিনি লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অলকা যাজ্ঞিকের মতো বিখ্যাত গায়িকাদের সঙ্গে ডুয়েট গান গেয়েছেন। বিশেষ করে লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল জুটির সঙ্গে তিনি প্রায় ২৫০টিরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন।
তবে, ১৯৮৮ সালে "কয়ামত সে কয়ামত তক"-এর মুক্তির পর বলিউডে সঙ্গীতের ধারায় পরিবর্তন আসে। নতুন গায়করা যেমন কুমার শানু, উদিত নারায়ণরা আসেন, পুরনো দিনের গায়কদের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আজিজও এ সময় বেশ অনুপস্থিত হয়ে পড়েন এবং অনেকদিন ধরে কোনো পুরস্কার অনুষ্ঠান বা প্রজেক্টে ডাক পাননি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "এখনকার নতুন গায়কদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, হয়তো আমাদের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে।"
ব্যক্তিগত জীবন ও বিতর্ক
২০১৭ সালে কর্ণ জোহরের "অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল" ছবির একটি সংলাপ নিয়ে মহম্মদ আজিজ বিতর্কে জড়ান। ওই ছবিতে একটি সংলাপে বলা হয়— রফির গান শুনলে বোঝা যায় না তিনি গাইছেন নাকি কাঁদছেন। এই কথা শুনে আজিজ খুব রেগে যান এবং কর্ণ জোহরকে বয়কট করার ঘোষণা দেন।
মৃত্যু
২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর, কলকাতা থেকে মুম্বই ফেরার পথে আজিজ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মুম্বইয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার পথে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আজিজের প্রয়াণের পর বলিউডের কোনো তারকা বা শিল্পী তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেননি, যা অনেকেই হতাশাজনক হিসেবে মন্তব্য করেন।
উপসংহার
মহম্মদ আজিজ ছিলেন এক অবিস্মরণীয় কণ্ঠশিল্পী, যার গানের ভেতর দিয়ে রফির মতো কিংবদন্তির শ্বাস প্রতিধ্বনিত হত। তার সঙ্গীত জীবনের উত্থান-পতন সত্ত্বেও তিনি বলিউডে নিজের এক স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছিলেন। আজিজের কণ্ঠের জাদু আজও সংগীতপ্রেমীদের মনে জীবন্ত।


0 coment rios: