নীলফামারীর বড় মাঠকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা চাঁদাবাজি, মারধর ও নারী উত্ত্যক্তের ঘটনায় অবশেষে কঠোর অবস্থানে গেল জেলা পুলিশ। জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে চক্রের এক সক্রিয় সদস্য মো. মামুন শেখ (২৫) কে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও, একই সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রকাশ্যে অপরাধ, নারী নির্যাতন এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নীলফামারী সদর থানাধীন চড়াইখোলা বটতলী বাজার এলাকার পাশের একটি কবরস্থান সংলগ্ন এলাকা থেকে মো. মামুন শেখকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত মামুন ওই এলাকার পরিচিত একটি চক্রের সদস্য, যারা বড় মাঠে আগত দর্শনার্থীদের টার্গেট করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, আসামিসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ব্যক্তি ভুক্তভোগী তাপস রায়কে অবৈধভাবে আটক করে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্থা করে। এরপর তার কাছে ৫,০০০ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আসামিরা তাকে গালিগালাজ, চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারতে থাকে। শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনার ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করা হয়।
ভুক্তভোগীর স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাকেও নানাভাবে হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে চাঁদার টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ওই চক্র ভুক্তভোগীর সম্মানহানি ও ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে ধারণকৃত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জনসম্মুখে চলে আসে এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হলে কোমলমতি শিক্ষার্থী, সচেতন অভিভাবক, স্থানীয় প্রশাসন ও সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দেয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, প্রকাশ্য মাঠে এ ধরনের অপরাধ কীভাবে দিনের পর দিন চলতে পারে এবং কেন এতদিন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে ডিবি পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং গোপন নজরদারির মাধ্যমে অভিযানে নামে ডিবি। এরই ধারাবাহিকতায় অভিযুক্ত মো. মামুন শেখকে গ্রেফতার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মামুন শেখ স্বীকার করেছে, সে ও তার চক্র দীর্ঘদিন ধরে বড় মাঠে আগত দর্শনার্থীদের টার্গেট করে চাঁদাবাজি, মারধর, নারী উত্ত্যক্তসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। তারা ভুক্তভোগীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত এবং প্রয়োজনে ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করত।
এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ দণ্ডবিধি এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃতের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনসচেতনতা ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ কতটা জরুরি। বড় মাঠের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এমন অপরাধ শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো সমাজের জন্যই হুমকি। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই পারে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে।


0 coment rios: