Nov 23, 2024

১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় তাঁর নির্মিত পুরোপুরি রঙিন ছবি সীমানা পেরিয়ে।

 সীমানা পেরিয়ে


সীমানা পেরিয়ে

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের তিন মাস পর বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চলে একজোড়া মানব-মানবীর করুণ অবস্থার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তা আলমগীর কবিরকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এ ছাড়াও তিনি প্রভাবিত হন ইতালিয়ান নির্মাতা লিনা ভেটমুলারের ১৯৭৪ সালের ছবি Swept Away-এর চিত্রধারা থেকে। সেই ভাবনা থেকে চিত্রনাট্য রচনা করেন এবং ১৯৭৫ সালে শুরু হয় শুটিং।

১৯৭৭ সালে মুক্তি পায় তাঁর নির্মিত পুরোপুরি রঙিন ছবি সীমানা পেরিয়ে। সাধারণত "সীমানা" বলতে ভৌগোলিক সীমারেখাকে বোঝালেও, আলমগীর কবির এই ছবিতে শ্রেণি-বৈষম্য ও সমাজের ভেদাভেদকে অতিক্রম করার গল্প তুলে ধরেছেন।


কাহিনি

ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র টিনা জমিদারের নাতনি, আর কালু জেলে পরিবারের প্রতিনিধি। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা দু’জন একটি নির্জন দ্বীপে ছয় মাস আটকে পড়ে। টিনা প্রথমে কালুকে ঘৃণা এবং ভয় করে, কারণ সে প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে নিম্নবিত্ত শ্রেণির। কালুর তোতলামি তার জীবনের সংগ্রামের প্রতিবিম্ব। কিন্তু ধীরে ধীরে টিনা কালুকে ভালোবাসতে শেখে এবং শ্রেণি ভেদাভেদের সীমানা অতিক্রম করে।

দ্বীপ থেকে ফিরে টিনা জানতে পারে, তার মা ঘূর্ণিঝড়ে মারা গেছেন এবং তার বাবা তার বান্ধবীকে বিয়ে করেছেন। টিনা-কালুর ভালোবাসা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় টিনার বাবা। এর উত্তরে টিনা বলে, “ওরাই হলো সাইলেন্ট মেজরিটি। একদিন ওরা জাগবে।” ছবিতে দুর্যোগকে বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

নির্মাণের কাহিনি

ছবির শুটিং হয়েছিল কক্সবাজারের কাছাকাছি একটি দ্বীপে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরো ইউনিটকে কাজ করতে হতো। কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয় এফডিসি, বেঙ্গল স্টুডিও এবং কালিয়াকৈরের জমিদারবাড়িতে।

পরিচালক আলমগীর কবির ছিলেন অক্সফোর্ড পড়ুয়া, বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। তাঁর ছবিতে সাম্য ও শ্রেণি বিপ্লবের প্রতিফলন দেখা যায়। শুটিং চলাকালে কাজী হায়াৎ সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং পরিচালকের সুনজরে আসেন।

ছবির প্রধান চরিত্রে ছিলেন বুলবুল আহমেদ এবং জয়শ্রী কবির (সাবেক মিস ক্যালকাটা ১৯৬৮), যিনি সত্যজিৎ রায়ের ছবিরও নায়িকা ছিলেন।


অর্জন

সীমানা পেরিয়ে চারটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে—শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (বুলবুল আহমেদ), শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা (আলমগীর কবির), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক (বশীর হোসেন), এবং শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (এম এ মোবিন)। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের বিচারে এটি সেরা ১০ বাংলাদেশি ছবির একটি।

গান ও সংগীত

ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁর গাওয়া "মেঘ থমথম করে" এবং আবিদা সুলতানার কণ্ঠে "বিমূর্ত এই রাত্রি আমার" আজও জনপ্রিয়।

নির্মাণ বাজেট ও প্রদর্শন

চার লাখ টাকা বাজেটে নির্মিত ছবিটি আর্থিকভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি, যা আলমগীর কবিরকে হতাশ করেছিল। তবুও, এটি বাংলা চলচ্চিত্রের এক মাইলফলক হয়ে রয়ে গেছে।



পরিচালনা ও প্রযোজনা: আলমগীর কবির
অভিনয়: বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবির, কাফি খান, মায়া হাজারিকা, গোলাম মোস্তফা
মুক্তি: ১৯৭৭


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: