দেশের প্রথম ‘সুপারস্টার’ গায়িকা,গানের শেষে,প্রত্যয়ের সিগনেচার কণ্ঠ "মাই নেম ইজ গওহর জান
![]() |
| গানের শেষে,প্রত্যয়ের সিগনেচার কণ্ঠ "মাই নেম ইজ গওহর জান |
একসময় বাজারে এক ভরি সোনার দাম ছিল ২০ টাকা। সেই সময়, একটি গান গাইতে গওহর জান নামের প্রথম ‘সুপারস্টার’ গায়িকা ৩,০০০ টাকা পারিশ্রমিক নিতেন। চমকে উঠবেন না! তাঁর গান শেষে শোনা যেত, "মাই নেম ইজ গওহর জান!" যখন গওহর সাফল্যের শিখরে ছিলেন, তখন তিনি সন্ধ্যায় রেশমি পর্দা এবং ছয় ঘোড়ার ফিটনে মাঠে বেরিয়ে বেড়াতেন।
একবার, এক ইংরেজ রাজপুত্র এই ঠাটবাটে বিরক্ত হয়ে গওহরকে ১,০০০ টাকা জরিমানা করেছিলেন। গওহর সেই টাকা মুহূর্তে তাঁর মুখে ছুড়ে মারেন। যদিও অনেকেই প্রকাশ্যে নাক সিঁটকাতেন, তথাকথিত অভিজাতদের কাছে তাঁকে গ্রহণ করতে হতো। আড়ালে অনেকে তাঁকে ‘বাঈজি’ বললেও, শিল্পীর সম্মান জ্ঞাপনকারী উদার মানসিকতার মানুষও ছিলেন। তাতে গওহর জানের কিছু যায় আসেনি, কারণ তিনি ইতিহাসের এক অধ্যায়।
তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় শিল্পী যিনি গানের রেকর্ড করিয়েছিলেন এবং দেশের প্রথম কোটিপতি সংগীত শিল্পী হিসেবে পরিচিত। গওহরের জীবন নিয়ে আলোচনা করার আগে, একটু পেছনে ফিরে যাই। বেনারসের বাঈজি পাড়ায় সংগীতের কত্থক মলকা জানের জনপ্রিয়তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বেনারস থেকে কলকাতা চলে আসেন।
এদিকে, ইংরেজ সৈনিক হার্ডি হেমিংস ভারতীয় রুক্মিনীকে বিবাহ করেন, তাদের কন্যা অ্যাডলিন ভিক্টোরিয়া হেমিংস। অ্যাডলিনের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। একা সন্তানকে বড় করা কঠিন হচ্ছিল। সেই সময় তিনি খুরশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মেয়ের নাম গওহর রাখেন। এরপর মলকা জান হয়ে কলকাতায় এসে নাচ-গান শুরু করেন।
তিনি ক্লাসিক্যাল হিন্দুস্তানি ও ভোকাল মিউজিকের পাশাপাশি কত্থকে তালিম নেন। ১৮৮৭ সালে দ্বারভাঙা রাজের দরবারে আত্মপ্রকাশ করেন, এবং ১৯১০ সালে প্রথমবার মাদ্রাজে যান। ধীরে ধীরে তিনি সবচেয়ে দামি শিল্পীদের একজন হয়ে ওঠেন।
শুধু অভিজাত শ্রেণী নয়, গওহরের গান সবার কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা শুরু হয়। ১৯০২ সালে 78rpm-এ তাঁর প্রথম গান রেকর্ড করা হয়, যা গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া বাজারে ছাড়ে। গওহর 'দ্য গ্রামোফোন গার্ল' নামেও পরিচিত। তিনি ৬০০টির বেশি গান গেয়েছেন।
তবে মামলা মোকাবেলার জন্য জমি-বাড়ি বিক্রি করতে হয় তাঁকে। গওহরের কিছু উল্লেখযোগ্য গান হল ‘জবসে গয়ে মোরি সুদ’, ‘রস কে ভরে তোরে ন্যায়ন’, এবং ‘মেরে দর্দ-ই-জিগর’। তাঁর গাওয়া ভজন ‘রাধে কৃষ্ণ বোল মুখসে’ আজও জনপ্রিয়।
শেষে, প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে মামলায় সর্বস্বান্ত হয়ে কলকাতার বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন গওহর। মহীশূরের রাজার ডাকে তিনি চিরতরে কলকাতা ত্যাগ করেন। ১৯৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি মারা যান। তাঁর প্রয়াণ ভারতীয় সংগীতের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও গওহর জান ছিলেন ভারতীয় সংগীতের দাপুটে রানী, যাঁর গান শেষে শোনা যেত সেই সিগনেচার কণ্ঠ, "মাই নেম ইজ গওহর জান!"


0 coment rios: